রাজশাহী পাসপোর্ট অফিস: টাকা দাও পাসপোর্ট নাও

রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে চলছে টাকার খেলা। টাকা ছাড়া যেন এখানে পাসপোর্ট পাওয়া, আর সোনার হরিণ পাওয়া একই ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে এমন যে-এই অফিসের প্রতিটি ইটও যেন পাসপোর্ট আবেদনকারীদের নিকট থেকে টাকা কেড়ে নিতে চায়। টাকা না দিলে অফিসে ঢুকাও যেন বারণ হয়ে গেছে এখানে। ভয়াবহ এই অনিয়ম চলছে গত বেশ কিছুদিন ধরেই। কিন্তু পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে এর লাগাম টানা যাচ্ছে না।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফারুক নামের এক আবেদনকারী জানালেন, তিনি আগের দিন বুধবারও (১১ সেপ্টেম্বর)  একই কাগজপত্র আবেদন জমা দিতে গিয়েছিলেন। তখন অন্য ভুল ধরা হয়েছিল। সেই সময় দেলোয়ার হোসেন নামের অফিস সহকারী বলেছিলেন, ‘এসব ভুল কোনো ব্যাপার না; দেড় হাজার করে টাকা দেন, সময়মতো এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাইয়েন। ’ কিন্তু দুটি পাসপোর্টের জন্য তিন হাজার টাকা ঘুষ দিতে রাজি হননি তিনি (ফারুক)। তাই বুধবার কাগজপত্রে যেসব ভুল ধরা হয়েছিল সেগুলো সংশোধন করে পরের দিন জমা দিতে যান। কিন্তু এদিন আবার নতুন ভুল ধরে তাঁর কাগজপত্র আর জমা নেওয়া হয়নি।

নানা ভুলত্রুটি থাকলেও নজরুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তির পাসপোর্টের আবেদন ঠিকই জমা নেন দেলোয়ার হোসেন। বিনিময়ে তাঁর কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা নিয়েছেন। আনসার সদস্য জিয়ার মাধ্যমে ওই পাসপোর্ট করিয়েছেন দেলোয়ার হোসেন। রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে এভাবেই মানুষকে জিম্মি করে প্রতিদিন চলছে ঘুষের লেনদেন। পাসপোর্টের আবেদন জমা নেওয়ার নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লেনদেন হচ্ছে। কখনো বাইরের দালালদের মাধ্যমে, কখনো পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের মাধ্যমে পাসপোর্টপ্রতি এক হাজার ৫০০ টাকা করে লেনদেন করছেন ওই অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজশাহী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক আফজাল হোসেন থেকে শুরু করে অফিস সহকারী দেলোয়ার হোসেন, আনসারের পিসি হাসান আলী, আনসার সদস্য জিয়াসহ ওই অফিসের বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকা ছাড়া পাসপোর্টের আবেদন জমা নেন না। কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ টাকা দিলে এক দিনেই আবেদনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে দেন তাঁরা। পরে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কোনো একদিন এসে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে নিয়ে যায় আবেদনকারীরা। কিন্তু টাকা না দিলে রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ মানুষের কোনো আবেদন জমা নেওয়া হয় না। নানা ধরনের ভুলত্রুটি ধরে দিনের পর দিন হয়রানি করা হয়। গত দুই-তিন দিন ধরে অনুসন্ধানেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে।

টাকা লেনদেনের জন্য পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কখনো কখনো স্থানীয় দালালদেরও সহায়তা নেন। দালালরা আবেদনকারীদের কাছ থেকে এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেন। এরপর পাসপোর্টের আবেদন জমা নেওয়া হয়। দালালদের এই গ্রুপে রয়েছেন স্থানীয় মোস্তাক হোসেন, সোহরাব হোসেন, সুমন, রাজিব, দেবু, সনি, মানিকসহ ১৭ থেকে ১৮ জন।

তবে টাকা না দেওয়া আবেদনকারীদের হয়রানির শেষ নেই। পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে এসে দিনের পর দিন ঘুরে যেতে হয় তাদের। শেষে বাধ্য হয়ে একসময় হার মানে এবং দেড় হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পাসপোর্ট করায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সাধারণ মানুষের পাসপোর্টপ্রতি অন্তত ৮০০ টাকা না হলে উপপরিচালক সই করেন না। বাকি ৭০০ টাকা চলে যায় পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে।

দুর্গাপুর উপজেলার ওয়াদ আলী নামের এক আবেদনকারী বলেন, ‘প্রথমে আমি কয়েক দফা আবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বারবারই ভুল ধরে আমাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একবার আবেদনে ভুল ধরা হলে সেটি সংশোধন করতে আবার নতুন করে আবেদন ফরম পূরণ করতে হয়। আর প্রতিটি আবেদন ফরমেই লাগে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সই। এভাবে তিন দিন ঘোরার পরে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট অফিসের আনসারের পিসি হাসান আলীকে দুই হাজার টাকা দিয়ে আবেদন জমা দিতে পেরেছি। ’ তবে আনসারের পিসি হাসান আলী দাবি করেন, আবেদন জমা নেওয়া তাঁদের কাজ নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ নিরাপত্তা দেওয়া। আমরা কেন মানুষের কাছ থেকে টাকা নেব। এটা যারা বলছে, তারা ঠিক বলেনি। আমরা কারো কাছ থেকে টাকা নিইনি। ’

তবে ভুক্তভোগীরা কাছে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও অফিস সহকারী দেলোয়ার হোসেন তা অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য মতে, ‘আমি কারো নিকট থেকে টাকা নিই না। আবেদনে ভুল থাকলে তো সেগুলো ধরতেই হবে। না হলে যা ইচ্ছে তাই লিখে দিলে তো আর পাসপোর্ট হবে না। ’

ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে উপপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমার অফিসে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে কাউকে টাকা দিতে হয় না। এই ধরনের অভিযোগ সত্য নয়।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s