আলিবাবায় রাজশাহীর মেহেদী

আলিবাবা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। তার পণ্য পরিচালন ব্যবস্থাপক মেহেদী রেজা। আলিবাবার গোয়াংঝুর হেড অফিসেই অফিস করেন মেহেদী। মাহবুবর রহমান সুমন অনেক ব্যস্ত মানুষটির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত যোগাযোগ করে উঠতে পেরেছিলেন

নামটা এলো যেভাবে

আলিবাবা! প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা ২০০৬ সালে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, একদিন সান ফ্রানসিসকোর একটি কফি শপে বসেছিলাম। ভাবছিলাম পাশের মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করি, ‘আলিবাবা শব্দটি শুনেছ কি না। ’ একসময় জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। মেয়েটি উত্তর করল, ‘চি চিং ফাক (ওপন সিসেম)। ’ আমি ভাবলাম পেয়েই গেছি। তবু আরেকটু পরখ করে নেওয়া যাক। কফি শপ থেকে বেরিয়ে আরো ২০ জনের কাছে জানতে চাইলাম, বলো তো আলিবাবা কী? সবাই বলল, চি চিং ফাক। ওই ২০ জনের মধ্যে জার্মান ছিল, ভারতীয় ছিল, দক্ষিণ আমেরিকান ছিল। সবাই যেহেতু আরব্য রজনীর এই চরিত্রটিকে চেনে, তাই আমি নামটা নিয়ে নিলাম আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য। আলিবাবা খুব দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু চল্লিশ চোরের ধনরত্ন পেয়ে ধনী হয়ে ওঠেন। চি চিং ফাক একটা ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ড।

এখন দেখুন আলিবাবা সারা দুনিয়ায় সেরা একটি প্রতিষ্ঠান।

একজন মেহেদী

মেহেদীর জন্ম রাজশাহীর বাঘা উপজেলার হরিনা গ্রামে। কিন্তু বড় হয়েছেন ঢাকায়। ছোটবেলায় পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ছিলেন না। স্কুল পালানোর রোগও ছিল। তবে আউট বই পড়তে ভালোবাসতেন আর খুব ফুটবল খেলতেন। অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলে খেলার সুযোগও পেয়েছিলেন। তাঁর শখ ছিল পাইলট হওয়ার। ১৯৯৫ সালে মেহেদী এসএসসি পাস করেন। ১৯৯৮ সালে বিবিএ পড়ার জন্য গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। ব্রিসবেনের গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিপ্লোমা করে দেশে ফেরেন ২০০২ সালে। ব্রিসবেনেই তাঁর কম্পিউটার শেখা। আগ্রহ শেষতক দাঁড়ান গিয়ে ওই কম্পিউটারেই।

মেহেদী

পথচলা শুরু

২০০৩ সাল। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকায় কাজ নেন ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে। গ্রাফিক ডিজাইন আর টু-ডি অ্যানিমেশনের কাজও করতেন। নিজে নিজেই বই পড়ে শিখতে থাকলেন এইচটিএমএল, সিএসএস, পিএইচপির কাজ। সব মিলিয়ে প্রশিকায় ছিলেন পাঁচ বছর। এরপর গ্রামীণ ব্যাংকের ভনএয়ার নামের একটি প্রকল্পে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটি টেলিকমিউনিকেশন সফটওয়্যার ডেভেলপ করত বেশি। মেহেদী সেখানে ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ২০০৮ সালেই জাপানে কাজ করার সুযোগ পান। কাজটি ছিল চুক্তিভিত্তিক। সেখানে তিন মাস এপ্রিওরি (ধঢ়ত্রড়ত্র.পড়.লঢ়) নামের একটি ওয়েব সাইটের জন্য কাজ করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভনএয়ার ইনকরপোরেটেডে ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি সফটওয়্যার ইউআই ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন এবং অ্যানিমেশনের কাজ করতেন। ২০০৯ সালটিকে গুরুত্বপূর্ণ ধরেন মেহেদী। বিখ্যাত ডিজিটাল এজেন্সি উন্ডেরমানে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান। তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের ইন্টারঅ্যাকটিভ ম্যানেজার ছিলেন। উন্ডেরমানের বাংলাদেশের কাজকর্ম পরিচালনা করতেন তিনি। নকিয়ার ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের অনেক কাজই করেছেন তখন মেহেদী। ডিজিটাল প্রডাকশনেও সহায়তা দিয়েছেন। তখন তিনি ডিজিটাল মিডিয়া বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরে বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।   চার বছর উন্ডেরমানে কাজ করে ২০১৩ সালে ইমপ্রেস গ্রুপের সঙ্গে আইডিজিটাল নামের একটি এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন এর হেড অব ডিজিটাল এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। বছরখানেকের মধ্যেই হুন্দাই, নকিয়া, রানারের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারপর তো এলো ২০১৬। জুলাই মাসে ডাক পান আলিবাবার। নিয়োগ পান প্রডাক্ট অপারেশন ম্যানেজার হিসেবে।

পাঁচ মাস ধরে ইন্টারভিউ চলেছে

প্রযুক্তির জীবন কেমন?

১৪ বছর হয়ে গেল চাকরিজীবনের বয়স। আমি গ্যাজেটপ্রিয় মানুষ বরাবরই। সেই ১৯৯৮ সালে ম্যাসেঞ্জার দিয়ে অচেনা মানুষের সঙ্গে চ্যাট করতাম। নতুন নতুন প্রযুক্তি আমাকে মুগ্ধ করে। নিজ উদ্যোগেই আমি অ্যানিমেশন শিখি। একসময় আমার নেশা লেগে যায়। তাই শুধু পেশা নয়, প্রযুক্তি আমার প্যাশন।

আলিবাবায় যোগ দেওয়ার গল্প বলুন।

গল্পটি মজার। আমি নিজে কিন্তু আলিবাবায় চাকরির আবেদন করিনি। তারা এমন একজনকে খুঁজছিল যে বাংলাদেশের বাজার ভালো জানে। এখানকার সমাজ-সংস্কৃতি বোঝে। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিতেও দক্ষ। আমাকে তাঁর লিংকড ইনে খুঁজে পায়। তারপর জানতে চায়, আমি আলিবাবায় কাজ করতে আগ্রহী কি না। আমি রাজি হলে শুরু হয় সাক্ষাৎকার গ্রহণের পালা। সর্বমোট আটবার ইন্টারভিউ দিয়েছি। দুইবার সরাসরি, আর ছয়বার টেলিফোনে। আলিবাবার এক কর্মকর্তা আমার বাসায় ডিনার করার ছলেও আমার ইন্টারভিউ নিয়েছে। এটা খুবই মজার ব্যাপার ছিল। প্রায় পাঁচ মাস ধরে ইন্টারভিউ পর্ব চলেছিল। পাস করার পর ভিসা ও চীনে ওয়ার্ক পারমিট জোগাড় করতে চলে যায় আরো তিন মাস। শেষে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে আমি আলিবাবায় যোগ দিই।

আলিবাবায় আপনি কী ধরনের কাজ করেন?

প্রথমে আমি ইউসি ব্রাউজার ও ইউসি ক্রিকেট নিয়ে কাজ করতাম। বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মার্কেটের জন্য। তখন ইউসিকে পরিচিত করানোর ব্যাপারটিই ছিল বেশি। ভাবতাম আরো নতুন কী কী যোগ করলে ইউজাররা ইউসিকে গ্রহণ করবে। প্রথম তিন মাস আমি খুব ভালো পারফরম্যান্স দেখাই। সেরা কর্মীর অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলাম। তারপর কাজের পরিধি বেড়ে গেল। প্রডাক্টের পাশাপাশি বিজনেসের কাজও শুরু করলাম। এরপর নাইন অ্যাপসের (অ্যানড্রয়েড অ্যাপস ও গেইমস ডাউন লোডার) মিডিয়া বায়িং ও অ্যাডভার্টাইজমেন্ট নিয়ে কাজ করি। আমার ডেজিগনেশন প্রডাক্ট অপারেশন ম্যানেজার হলেও আমি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে ভালো বলে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ক্যাম্পেইনেও কাজে লাগায়।

ইউসি ব্রাউজার নিয়ে কিছু বলুন।

২০১৬ সালে ইউসি ব্রাউজারটি বাংলা ভাষায় চালু করে আলিবাবা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আলিবাবার এটিই একমাত্র চলমান সেবা। আমার কাজ ব্রাউজারটিকে ইউজারদের কাছে পছন্দনীয় করে তোলা। যেমন বাংলাদেশের মানুষ খবর জানতে ভালোবাসে। তাই ইউসির একটি নিউজ প্ল্যাটফর্মও আছে। ইউজারদের খরচ কমানোর চেষ্টাও করছি। চাইছি ইউসিকে সর্বনিম্ন ডাটাপ্যাকের ব্রাউজার বানাতে। ব্রাউজিংয়ে ইউজারদের আমরা চমৎকার অভিজ্ঞতা দিতে চাই।

আপনি আলিবাবায় একমাত্র বাংলাদেশি কর্মী। কেমন লাগছে আলিবাবা?

এখানে কাজ করা অনেক চ্যালেঞ্জিং। তাদের ভাষা ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, কাজের ধরন ভিন্ন। আমাদের থেকে প্রায় সব কিছুই আলাদা। মানিয়ে নেওয়াটা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আর ওরা কঠোর পরিশ্রমী। কঠোর পরিশ্রম ছাড়া এখানে টিকে থাকা কঠিন। এমন অনেক দিন গেছে সারা রাত সারা দিন কাজ করেছি। এখানে একটা সুবিধা হলো, সবাই বন্ধুসুলভ।

আলিবাবা ছাড়াও বিদেশি আরো কম্পানিতে আপনি কাজ করেছেন। ওরা কেনএগিয়ে?

 আমার মনে হয়েছে বিদেশি কম্পানিগুলো বেশি নজর দেয় কর্মীদের গড়ে তোলার ব্যাপারে। যেমন উন্ডেরম্যান আমাকে প্রায়ই প্রশিক্ষণে পাঠাত। বলতে গেলে প্রতি মাসেই। ওরা গবেষণার জন্যও অনেক সময় ব্যয় করে। আমাদের দেশি কম্পানিগুলোতে এগুলো বেশি দেখা যায় না।

(মেহেদী রেজার এই সাক্ষাৎকার ই-মেইলে গ্রহণ করা হয়েছে)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s